Aboriginal – Explore History, Language and Culture

গোরক্ষনাথ কূপ, বাংলাদেশের একমাত্র বেলে পাথরের কূপ ও গোরকূই মন্দির।

‘গোরক্ষনাথ কূপ ও গোরকূই মন্দির’
বাংলাদেশের একমাত্র বেলে পাথরের কূপ।
কথিত মতে নাথ পন্থিদের গুরু গোরক্ষনাথের জন্মস্থান এখানেই।

লিখেছেনMaroof Hussain Mehmet

এটা বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল থানার নেকমরদ হতে পশ্চিমে নয় কিলোমিটার যেয়ে গোরকূই নামক স্থানে অবস্থিত। ‘গোরক্ষ+কূই#গোরকূই’। এর অর্থ হলো গোরক্ষনাথের কুই বা কুয়া বা কূপ।

হিন্দু অধ্যুষিত মালদুয়ার স্টেট বা পূর্ব দিনাজপুরের ভারতীয় এক প্রাচীন জনপদ এটি।পরে দেশভাগের পর এটা বাংলাদেশে পড়েছে।এখানে স্মর্তব্য যে,মুসলমানরা এ জনপদে আসে অনেক পরে। মূলত পীর শাহ নেকমরদ ছিলেন সিলেটী হযরত শাহজালাল রা: এর অন্যতম সহযাত্রী যারা বিচ্ছিন্নভাবে সারা বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারকারী ছিলেন।

মনে রাখা দরকার,মন্দির বা কূপটি এমন এক জায়গায় অবস্থিত যার চারদিক একটা বিস্তৃত নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত। এর বর্তমান পূর্ব বা পশ্চিম কিংবা দক্ষিণ হয়ে একটা রাস্তা আলসিয়ার হাট ভকরগাঁও হয়ে বালিয়াডাঙ্গী-নেকমরদ-রাণীশংকৈল বিশ্বরোডে মিলেছে।এদের মাঝে কেবলমাত্র পশ্চিমদিকের রাস্তাটাই সর্বজন স্বীকৃত পথ এই মন্দিরে আসার।তার কারণ, উত্তর-পূর্ব দিক থেকে কাইচা নামে খরস্রোতা নদী প্রবাহিত ছিল।

বলা হয়ে থাকে, দলে দলে হিন্দুদের মুসলমান হবার প্রভাবে মীনপন্থিদের গুরু গোরক্ষনাথ পশ্চিমদিক থেকে জাতিধর্ম টিকাতে এ অঞ্চলে আসেন। আর এটাও মনে রাখা দরকার যে,কাইচা নদীটি আজ তার জৌলুশ হারিয়ে বিলে পরিণত হলেও এটা এককালে সগৌরবে প্রবাহিত ছিলো। আঠারোশ শতাব্দীর ভূমিকম্পে এ অঞ্চলের ভূমিগত পরিবর্তন হলে এটা উঁচু হয়ে যায় আর কাইচা নদী কালেরগর্ভে হারিয়ে বিল বা জলাধারে রূপ নেয়।

পীর শাহ নেকমরদ কোনভাবে গোরক্ষনাথের সমসাময়িক এটা মানতে নারাজ ইতিহাসবিদেরা। আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া বা বৃহত্তর বরেন্দ্র নিয়ে কাজ করা কেউ তা উল্লেখ করেন নি।আরেকটা প্রমাণ হতে পারে এর উত্তরপার্শ্বস্থ চারচালা ঘর থেকে প্রাপ্ত শিলালিপি। প্রায় দূর্বোধ্য আর বিলীয়মান ক্ষয়িত এ লেখার মর্ম আজো অনাবিষ্কৃত।অথচ, সুলতানি আমলে পরবর্তী মেরামতকার্য করা হলেও অন্যান্য শিলালিপির মত এটি পরিষ্কার নয়।আবছা আর ধোঁয়াশা।

কূপটির বৈশিষ্ট্য হলো এটি চুনসুরকি বা অন্যান্য মালমসলা ছাড়াই নিরেট বেলেপাথর কেটে সাইজ করা টুকরো দিয়ে তৈরী। মূল ভূমি থেকে তিন বা সাড়ে তিন ফুট নিচে এটি অবস্থিত।এর পশ্চিমপার্শ্বে পানি প্রবাহের ঢাল দেখা যায়।দক্ষিণপাশের দেয়ালে সাটানো অবয়ব প্রায় বিলীয়মান। সিঁড়িগুলোও বেলেপাথরের তৈরী।
গোটা এলাকায় মোট পাঁচটি মন্দির। উত্তরে শিবমন্দির, পূর্বে শিবমন্দির, তার লাগোয়া দক্ষিণের মাঝের মন্দিরটা কালীমন্দির, তার লাগোয়া দক্ষিণের মন্দিরটা হলো শিবমন্দির।

আর কূপ সংলগ্ন দক্ষিণমুখী মন্দিরটিই হলো সমাধিমন্দির বলে মত আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার। স্থানীয় লোকগাথা আর প্রচলিত জনশ্রুতি তাই বলে। আবার একথাও শোনা যায় যে,আশির দশকে কালীমন্দিরটির নরমুণ্ড বেষ্টিত কালীমূর্তিটি পাচার হয় ভারতে।আর এটির সামনেই নরবলি দেয়া হত খুব গোপনে।যাতে ধর্ম আর অধর্মের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। কেননা,নাথপন্থিরা একটা সময় মনে করতো যে কালী বিরাগভাজন হয়েছে ধর্মের অবক্ষয় দেখে।আর এটার সমর্থনে বলা যায় প্রচলিত লোককাহিনী।

স্থানীয় হিন্দুরা যারা এই মন্দিরের পশ্চিমে প্রায় দুই কিলোমিটার সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ।আশেপাশে আরো পশ্চিমদিক আছে কিছু হিন্দুবসতি। আর মন্দিরসংলগ্ন উত্তরপূর্ব মুসলমান ঘর রয়েছে বর্তমানে ২২টি।এই মুসলিমরা মাত্র দুপুরুষ এখানে বসবাস করছে।এরা হলো ভারতীয় মালদহ আর মালনের লোক। স্থানীয়ভাবে যাদের আমরা ‘মালদহিয়া’ বা মালদহের অধিবাসী বলে থাকি।কাজেই এখানে কেবলমাত্র হিন্দু জনগোষ্ঠী বসবাস করতো। তাই, নরবলি এখানে হতো এমন কথা প্রচলিত। কেননা, ক্ষত্রিয় সম্প্রদায়ের হিন্দুরা সমাজে অস্পৃশ্য ছিলো। আর উচ্চবংশীয় হিন্দুদের সাথে তাদের বিরাট ফারাক ছিলো বলেই নিম্নবংশীয় হিন্দুরা জনশূন্য এ নীরব দ্বীপের মত জায়গাটিকেই বেছে নিয়েছিল তাদের পূজাকর্ম সাধনের জন্য। আর একথাও স্মর্তব্য যে,এ এলাকায় আর কোন সার্বজনীন মন্দির বা পুরাকীর্তি নেই। আর এখনো,এই মন্দির নিম্নবংশীয় হিন্দুদের দ্বারাই পদচারিত।

মন্দির পরিচালনা আর রক্ষণাবেক্ষণ করে স্থানীয় সেবায়েত কমিটি।পূজার্চনা ও মেলার আয়োজকও তারা।

কূপসংলগ্ন মন্দিরের সামনেই রয়েছে পাঠাবলীর স্থান।তবে, স্থানীয় সেবায়েত আর পুরনো হিন্দু বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে এটা জেনেছি যে,এই পাঠাবলীর স্থানটি এখানে নয় বরং কালীমন্দিরের সামনেই ছিলো। পরে হয়তোবা এটা স্থান বদল করেছে।এ কথার সমর্থনে এটা বলা যায় যে,পাথরের এই বলির স্থানটি বা পাথরগুলো নিচ থেকে ভিত্তিমূলে প্রোথিত নয়।

মূল কূপটির চারদিকে দেয়ালঘেরা। আর এর পূর্বদিক রয়েছে প্রবেশপথ।
হিন্দু সম্প্রদায় মনে করে এ কূপ অলৌকিকভাবে উত্থান হয়েছে।যদিও এখানে ইতিহাস আশ্রয়ী লোককথা আর ধর্মবিশ্বাসের প্রভাব স্পষ্ট।পূর্বে বহমান খরস্রোতা কাইচা নদীর জলপ্রাপ্যতা এই কূপে পানির যোগান দিত।এ প্রসঙ্গে বলা যায়,ভারতের মুঘল আমলে নির্মিত কূপগুলো। যেখানে ক্রমান্বয়ে এমনি কূপ একটার পর আরেকটাতে পানির যোগান দিত।এমনকি সিন্ধু সভ্যতায় এমন জলাধার ও জলবন্টন ব্যবস্থা ছিলো। আবার আমাদের এই বৃহত্তর দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও এলাকাজুড়ে অন্যান্য পুকুর বা জলবন্টন ব্যবস্থা গতানুগতিক সাদামাটা। যা এই কূপটির মত নয়।এখানেও কূপটির গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক বয়স অনেক।এটিকে অনন্যতা দিয়েছে এর ব্যতিক্রম গঠন,রহস্যময়তা, কম তথ্যপ্রাপ্তি ও সঠিকতর পাঠোদ্ধার না করতে পারা। যেখানে এটা একটা সুদূরপ্রসারী আর তখনকার প্রেক্ষিতে বিরাট এক সাফল্য যা অতি প্রাচীন ও গবেষণার বিষয়।কেবলমাত্র পাথর সরিয়ে বা এর চারপাশ দূর থেকে খনন করেই সঠিকতর গঠনরূপ প্রমাণিত হতে পারে। তবে সেটা আদৌ সসম্ভব নয়।কারণ, তাতে করে কূপটিই নষ্ট হবে আর মহামূল্যবান ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি তার জৌলুস হারাবে। যতোটা সম্ভব পুরনো স্থাপনার ভিত্তিমূলে পুনরায় এসব মন্দির নাকি স্থাপিত হয়।তার প্রমাণ, সুলতানি আমলের সমাজব্যবস্থা আর চমতকার শাসন। সম্ভবত চারচালা ঘরের নিচের চৌকাঠ হতে প্রাপ্ত শিলালিপিটি পুনরায় সংস্কার করার পরেই স্থাপিত। এখানে তেমন কোন অর্থ উদ্ধার সম্ভব হয়নি এটির দূর্বোধ্য আর বিলুপ্ত ক্ষয়িত ভগ্নদশার জন্য।তবে শিলালিপির ‘খরগাম’ শব্দটির সাথে জড়িয়ে আছে আরেক সুবিস্তৃত ইতিহাস।

সর্বশেষ ২০১৩ সালে মন্দিরগুলোসহ সমগ্র স্থাপনাটির সংস্কার করে এটিকে যতোটা সম্ভব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়।আর তাই মোটামুটি ভালো অবয়ব নিয়েই এটি দাঁড়িয়ে আআছে সুগভীর অতীতের রহস্যময় কান্না,ত্যাগ,বলি আর গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে।

ফাগুনমাসের শিবচর্তুদশীতে হিন্দুরা এখানে পুণ্যস্নানে আসেন। রোগমুক্তি আর পুণ্যলাভের আশায়।বারুনীর মেলার সময় জমজমাট লোকারব হয় এখানে।

Share..

Share on twitter
Share on email
Share on whatsapp
Share on facebook
Categories

Leave a Reply

Recent Posts

কেন শুধু রাজবংশী না বলে কোচ রাজবংশী বলা হয়। ঐতিহাসিক দলিল।

রাজবংশী জাতির ইতিহাস : ঐতিহাসিক দলিল By Mrinmay Barman কামরূপ অঞ্চলের রাজবংশী জাতির ইতিহাস নিয়ে অনেক লোক কথা , কল্পনা তত্ব প্রচলিত । সেই সঙ্গে

Read More »

উত্তরবঙ্গের বুকে চরমপন্থী আন্দোলনের জন্য তৎকালীন সরকার অনেকাংশে দায়ী।

উত্তর বঙ্গের বুকে চরম পন্থী আন্দোলনের জন্য তৎকালীন সরকার অনেকাংশে দায়ী। – লিখেছেন প্রদীপ রায় উত্তর বঙ্গের বুকে সশস্ত্র সংগ্রাম কিন্তু একদিনে হঠাৎ করে জন্ম

Read More »

Koch - Rajbanshi - Kamtapuri

উত্তর-পূর্ব ভারতের 7 টি রোমহর্ষক ভুতুড়ে জায়গা।

উত্তর-পূর্ব ভারতকে প্রায়ই ভারতের অপ্রচলিত স্বর্গ বলা হয় এর শান্ত স্নিগ্ধতা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মনোমুগ্ধকর তথা মায়াবী পরিবেশের জন্য। স্বভাবের সাথে সান্নিধ্যের পাশাপাশি এর উত্তাল

Read More »

কোচ কামতার মহারাজা প্রাণনারায়ণের রাজত্বকালত বিভিন্ন মন্দির প্রতিষ্ঠা। 

মহারাজা প্রাণনারায়ণ (১৬৩২-১৬৬৫) মন্ত্রী: ভবনাথ কার্যী  মহারাজা প্রাণনারায়ণ ১৬৩২ খ্রীষ্টাব্দে সিংহাসনত বৈসেন। কিন্তুক রাজ্যচালনার বিচক্ষণতা না থাকাতে উমার সমায়ৎ বারেবারে কোচ  কামতা রাজ্য বিপদের সম্মুখীন হৈচিল। জ্ঞাতি গোষ্ঠীর

Read More »

Literature & History (English)

1864 -1883 সাল পর্যন্ত কোচবিহারের কমিশনার আর ডেপুটি কমিশনারের নাম।

কমিশনার কর্ণেল হটন – 1864 ফেব্রুয়ারি থাকি কর্ণেল ব্রুশ ও এগনু – 1865 জুলাই থাকি কর্ণেল হটন – 1867 জানুয়ারি থাকি রিচার্ডসন আর মেটকাফ –

Read More »

Tour & Travel

উত্তর-পূর্ব ভারতের 7 টি রোমহর্ষক ভুতুড়ে জায়গা।

উত্তর-পূর্ব ভারতকে প্রায়ই ভারতের অপ্রচলিত স্বর্গ বলা হয় এর শান্ত স্নিগ্ধতা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মনোমুগ্ধকর তথা মায়াবী পরিবেশের জন্য। স্বভাবের সাথে সান্নিধ্যের পাশাপাশি এর উত্তাল

Read More »

গোসানী মঙ্গল কাব্যগ্রন্থের অঙ্গনার স্বপ্ন দর্শন, কান্তেশ্বরের জন্ম, কামতেশ্বরী মন্দিরের বড় দেউরীগণ। 

[১ম লহরী] নাম গুরু নিরন্জন পিতা মাতার শ্রীচরণ যাঁর তেজে ব্রহ্মান্ড সৃজন।  নম দেব গণপতি দুর্গা লক্ষ্মী সরস্বতী,  হরি হর ব্রহ্মা নারায়ণ।। ১ হরেন্দ্রনারায়ণ রাজা

Read More »
Subscribe to Blog via Email

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 1 other subscriber.