কোচরাজবংশী সমাজে নামকরণ উৎসব ও বিভিন্ন নাম।

নামকরণ উৎসব (কামতাপুরী কোচরাজবংশী) 

দ্বিতীয় কামানাের পর মা শিশুকে কোলে নিয়ে ঠাকুরবাড়িতে আসেন। ধােনার ওপর কিছ চিঁড়া ও দই রেখে অধিকারী তা অর্পণ করেন নারায়ণকে সেই সময় ধূপ আর প্রদীপ জ্বালানো হয়। ধােনার মন্ত্রপুত জলে ফুল ডুবিয়ে সেই জল মা ও ছেলের গায়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। মা তুলসী’-র সামনে হাঁটু গেড়ে বসে প্রণাম করেন আর এইভাবে সেবা দেওয়া হয়। কিছু গ্রামে দো কামানি’র পরে মা বাচ্চা নিয়ে বাড়ির অন্য লােকের সঙ্গে বাঁশঝাড়ে বা জঙ্গলে প্রতিষ্ঠিত গেরাম’ (গ্রাম্য দেবতা মহাদেব)-এর কাছে যায়। মা, হাটু গেড়ে মহাদেবের প্রতীকের (মাটির টিপি) সামনে বসে, মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেন। এরপর শিশুটির একটি নাম দেওয়া হয়। পরিবার খরচ বহন করতে পারলে এরপর আত্মীয়দের খাওয়ানাে হয়, বাজনাও বাজে। তা না হলে শুধুমাত্র গেরাম দেবতা-কে প্রণাম করেই অনুষ্ঠান সারা হয়।বেঁচে থাকলে ঠাকুরদা (আজু) বা ঠাকুমা (আবাে), তা না হলে নিকটবর্তী আত্মীয় শিশুর জন্মের মাস এবং সময় দেখে তার একটা নাম ঠিক করেন এবং তা সঙ্গে সঙ্গেই সবাইকে জানানাে হয়।

বর্তমানে (ষাট এর দশকে) মুখে ভাত বা ভাত-ছােওয়ার সময়ই নামকরণ করা হয়। দক্ষিণ বঙ্গের হিন্দুদের মতােই এই অনুষ্ঠান আর নামকরণও করা হয় পুরোনাে প্রথা থেকে ভিন্ন ধারায়।

আধুনিক কালে অবশ্য অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে এই নামকরণ উৎসবের। সচ্ছল পরিবারে ধূমধাম করে সন্তানের অন্যপ্রাশন বা মুখে ভাত অনুষ্ঠান পালন করা হয়। বাজনার দল আধুনিক চটুল গানের বাজনা বাজায় তবে গ্রামের দিকে এখনো আগের সেই কামতাপুরী স্টাইলের বাজনা (যেখানে সানাই এর মধ্যে একটা চিরাচরিত রুপ থাকে) বাজে। শহরান্চলেও কিছু কিছু পরিবার এখনো বাজনার সেই রুপ কে ভালোবেসে কামতাপুরী / কোচরাজবংশী ব্যান্ড পার্টিকেই আমন্ত্রন জানায়। 

কোচরাজবংশী সন্তানের নাম

মাসের শেষ দিনে (দমাশি; সংক্রান্তি) জন্ম হলে নাম রাখা হয় দমাশু। ভােরে জন্ম হলে ছেলের নাম রাখা হয় পােহাতু আর মেয়ের নাম পােহাতি। মাঝ রাতে জন্ম হলে নাম হয় আতিয়া।


নামের কিছু উদাহরণ 


দুখুরু…দুপুরে যার জন্ম

সাঁঝু.. সন্ধেয় যার জন্ম

আন্ধারা… কৃষ্ণপক্ষে যার জন্ম

জোনাকু…শুক্লপক্ষে যার জন্ম

আমাসু…. নতুন চাদের দিন যার জন্ম

পুনিয়া…পূর্ণিমার দিন যার জন্ম
দেবারু (পুং)…রবিবারে যার জন্ম।

দেবারি (স্ত্রী…রবিবারে যার জন্ম।
রবিরাম (পুং)…সােমবার যার জন্ম।

সােমারু (পুং)…  একই

সােমারি (স্ত্রী)… একই
মুংগলা (পুং)…মঙ্গলবার যাদের জন্ম।

মুংগলু/মংলু (পুং)… একই

মুংগলি (স্ত্রী… একই
বুধারু (পুং)…বুধবার যাদের জন্ম।

বুধু (পুং)… একই

বুধারি (স্ত্রী).. একই

বিষাদু (পুং)…বৃহস্পতি বার যাদের জন্ম।

বিষারু (পুং)… একই

বিরংষাদু (পুং)…একই

বিষাদি (স্ত্রী)… একই


শুকুরু…শুক্রবার যাদের জন্ম।

শুকারু… একই


শানু (পুং)… শনিবার যাদের জন্ম।

শনিয়া (স্ত্রী).. একই


বৈশাগু (পুং)…বৈশাখ মাসে যার জন্ম।

জেঠিয়া/জেটিয়া (পুং)… জ্যৈষ্ঠ মাসে যার জন্ম


আষাঢ়ু (পুং)…আষাঢ় মাসে যার জন্ম।

শাওনা (পুং)…শ্রাবণ মাসে যার জন্ম।

সানু (পুং)…


ভাদু (পুং)…ভাদ্র মাসে যার জন্ম।

ভাদরু (পুং)…

আঘু (পুং)…অগ্রহায়ণ মাসে যার জন্ম।

আগনী (পুং)…


পুষু (পুং)…পৌষ মাসে যার জন্ম।

পষু (পুং)…

পষুনাথ (পুং)…


মাঘু (পুং)…মাঘ মাসে যার জন্ম।

ফাগু (পুং)…ফাল্গুন মাসে যার জন্ম।

ফাগুনি (স্ত্রী)…

চৈতু (পুং)…চৈত্র মাসে যার জন্ম।

চৈতা (পুং)…

ঝড়ু (পুং).. ঝড়ের সময় যার জন্ম। 

ঝড়ুয়া (পুং)… একই

বানাটু (পুং)…বন্যার সময় যার জন্ম। 

বান-ভাসা (পুং)… বড় বন্যার সময় যার জন্ম

ভুই-চালু/ভৈচাল (পুং)… ভূমিকম্পের সময় যার জন্ম।

আকালু (পুং)… দুর্ভিক্ষের সময় যার জন্ম।

সােদোরু (পুং)… আত্মীয়ের বাড়িতে ভােজ খেতে গিয়ে যার জন্ম।

জাঙ্গলু (পুং/স্ত্রী)… জঙ্গল থেকে ফিরে আসার পর যার জন্ম।জঙ্গলু (পুং)…

মুতুরা (পুং)… প্রস্রাবখানায় যার জন্ম। (এটা ঠিক নয়, আসলে যে বাচ্চা ঘন ঘন প্রস্রাব করে সেই হিসাবে তার নাম মুতুরা রাখে পাড়া পড়শি ) 

ভিরা (পুং/স্ত্রী)… বাড়ির আবর্জনা ফলে দেওয়ার পর যার জন্ম। (? ) 

কান্দুরা (পুং)… জন্মের পর যে বাচ্চা বেশী কাঁদে। 

কান্দুরি (স্ত্রী…বাসিয়া (স্ত্রী/পুং)… যে বাচ্চা জন্মের অনেক পরে পেচ্ছাপ করে। (? ) 


মােটা (স্থূলকায় শিশু), বাটু বাংরু (বামন); ঢ্যাপা (মােটা); খ্যাকা (রােগা); ধইলু, গোরাচান, রুপাে (রং ফরসা হলে); কালঠু, কালিয়া, কালঠা (রং কালাে হলে); ধরপারু (ছটফটে) 


পাখি, পশু, ফল, পতঙ্গ এসবের নামে কিছু নাম রাখা হয় পখী, খঞ্জন, কাউয়া, চিলা, জোনাকি, ফড়িঙ্গা, ময়না, ব্যাং, বিলাই, চিকা, সলেয়া, চেংটিয়া (মাছ), চেরা (কেঁচো),পশুনাথ (সিংহ), তেলসুপারি, খলিসা (মাছ), আমকান্ত (আমগাছ), ছেকা (মাছ) ইত্যাদি।


দুর্গা (দেবী), কলকান্ত (কলাগাছ), ধরণী (পৃথিবী), নদী-রাম (নদী), পাটেশ্বর (পাট দেবতা) ইত্যাদি।
মেয়েদের নাম সাধারণ সরী, শ্বরী, ‘বালা’ ইত্যাদি দিয়ে শেষ হয়। পদবি সাধারণত হয় ‘বর্মণী দেবী’, ‘দাসী’ ইত্যাদি দিয়ে শেষ হয়।

আরো কিছু নাম যেমন অনেশ্বরী, অত্নেশ্বরী, আয়ানেশ্বরী, উপেশ্বরী, উপমতী, কাতিশ্বরী, কান্দুরী, চম্পা, চুয়াপানী, জলেশ্বরী, চেতনসােরি, দেখনসােরি, নয়নসােরি, দিভিসােরি, ভুদনসােরি, ঝিরিবালা, তুলতুলি, ফেলানি, বানে, ফুলমতি ইত্যাদি।

বর্তমানে বা আধুনিক যে নামগুলো প্রচলিত তা প্রায় সবই সংস্কৃত থেকে নেওয়া বা ধীরে ধীরে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ও আর্যকরণ হওয়ার দরুন। 

ডঃ চারুচন্দ্র সান্যাল রচিত “উত্তরবঙ্গের রাজবংশী” থেকে গৃহীত সাথে কিছু মন্তব্য।

Share..

Share on twitter
Share on email
Share on whatsapp
Share on facebook

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Random Posts

Admin/Contributor: Vivekananda Sarkar

Admin/Contributor: Vivekananda Sarkar

Dairy Technologist, Microbiologist
Special interest to explore History, Language and Culture। Koch-Rajbanshi-Kamtapur

Author/Contributor: Paritosh Karjee

Author/Contributor: Paritosh Karjee

Teacher, Tufanganj, Coochbehar

Author/Contributor: Rohit Barman

Author/Contributor: Rohit Barman

Poet, Mathabhanga, Coochbehar

Author/Contributor: Kumar Mridul Narayan

Author/Contributor: Kumar Mridul Narayan

Teacher, Tufanganj, Coochbehar

Author/Contributor: Ajit Kumar Barma

Author/Contributor: Ajit Kumar Barma

Social Worker, Mathabhanga, Coochbehar

Search the Business Directory

error: Content is protected !!