Photo of the Remarkables mountain range in Queenstown, New Zealand.

পঞ্চানন বর্ম্মা সহযােগী হেদেল্লা বর্ম্মা এবং মাথাভাঙ্গা পরগনার নায়েব আহিলকার আশুতোষ ঘােষ

অজিত কুমার বর্মা

তৎকালীন কুচবিহার রাজ্যের মাথাভাঙ্গা পরগনার প্রশাসনিক আইনি পর্যায়ের একটি অলিখিত অধ্যায়। অলিখিত বললাম এই কারণেই যে শুধুমাত্র এই বিষয়টি নিয়ে এ পর্যন্ত কোথাও লেখা হয়নি। এমনকি চিন্তন সমাজেও কোথাও আলােচনা-পর্যালােচনা হয়নি। যতটুকু তথ্য ও তত্ত্ব পাওয়া যাচ্ছে তা মাথাভাঙ্গার বা এই পরগনার অন্য পর্যায়ের ইতিহাসে প্রসঙ্গক্রমে আসা। এবং তাও খুবই সামান্য। তা দিয়ে প্রমাণ আকারের একটি প্রবন্ধ লেখা খুবই কঠিন। তবুও এই পরগনার সুচিন্তিত পাঠক সমাজের দৃষ্টি আকর্ষন করতেই এই প্রসঙ্গের অবতারণা। প্রসঙ্গের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন হেদেল্লা বর্ম্মা নামের একজন ক্ষত্রিয় রাজবংশী কর্মকর্তা এবং তৎকালীন নায়েব আহিলকার আশুতােষ ঘােষ ও প্রতক্ষ্য বা অপ্রতক্ষ্যভাবে পঞ্চানন বর্ম্মা।

একজন উত্তরপূর্ব ভারতের মনীষী, রাজবংশী জাতির জনক পঞ্চানন বর্মা। অন্যজন চাকরি করতে আসা বাঙালি প্রশাসক কর্ম্মচারী এবং তৎকালীন কুচবিহার রাজ্যের সাধারণ রাজবংশী প্রজা হেদেল্লা বর্ম্মা।

পরিচিতি

পঞ্চানন বর্ম্মা: তৎকালীন মাথাভাঙ্গা ME স্কুলের কুচবিহারের কৃতি সন্তান। উত্তরপূর্ব ভারতের প্রথম স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব। আইন পাশ করে ওকালতি পেশায় নিজেকে নিয়ােজিত করেন রংপুরে। এবং এই রংপুরে অবস্থানকালে সমাজ সেবায়, সমাজ সংস্কারের কাজে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত করেন। তিনি একাধারে সমাজ সংস্কারক, কামতাবেহারী ভাষা সাহিত্যের উপাসক, নারী কল্যাণকামী, নারী নির্যাতনকারী নিপাতী, সমগ্র রাজবংশী জাতিকে শিক্ষায়-দীক্ষায় উচ্চ শিখরের আলােয় আলােকিত করার প্রচেষ্টায় নিয়ােজিত, নিবেদিত একজন যােগী।

আশুতােষ ঘােষ: যিনি জীবিকার টানে স্বতন্ত্র কুচবিহার রাজ্যের একটি পরগনার নায়েব আহিলকার হয়ে আসা রাজকর্ম্মচারী। উনবিংশ শতাব্দীর ৭০এর দশকে জন্ম গ্রহণ করেন আশুতােষ ঘােষ। ছাত্রাবস্থাতেই পিতৃদেব বিয়ে দিয়ে দেন আশুতােষ ঘােষের সঙ্গে নারায়ণী দেবীর। বিয়ের পর তিনি আইন পরীক্ষা পাশ করে দেশীয় রাজ্য কুচবিহারে আসেন নায়েব আহিলকারের চাকরি নিয়ে। আশুতােষ ঘােষের তেরটি সন্তান। মাথাভাঙ্গা পরগনার এলিট সংস্কৃতি মনস্ক মানুষজনের সঙ্গে তাঁর ছিল নিবিড় যােগাযােগ। তিনি নারী শিক্ষা প্রসারেও অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছিলেন। তিনি মদনমােহন বাড়ির পার্শস্থ জমি প্রদান করে নাট্যমঞ্চ তৈরির ব্যবস্থা করে দেন। মাথাভাঙ্গার বুকে যে হলটি আজও আশুতােষ হল নামে সুপরিচিত। “অবসররঞ্জিনী” নামক একটি দলও তারই উৎসাহে মাথাভাঙ্গার বুকে সৃজন হয়। যে দলের মধ্যমণিও ছিলেন তিনি। (কিন্তু তিনি পাশাপাশি এই ‘অবসররঞ্জিনী’-তে বেছে বেছে এমন মানুষজনকে গ্রহণ করতেন যে তা সাধারণ মাথাভাঙ্গাবাসী ভাল চোখে দেখতেন না। এ ঘটনার প্রত্যুত্তরেই কি মাথাভাঙ্গার বুকে অন্য একটি দলের নাম পাওয়া যায় যে নামটি শুনলেই প্রতিবাদী ভাবনা মনে আসে। সে দলের নাম ‘অবহেলিত গােষ্ঠী’। তবে কি অবহেলার পাত্র যারা তাঁরাই এ দলের প্রতিষ্ঠাতা? নাকি আশুতােষ বাবুর সেই এলিট ভাবধারাকে ধাক্কা দেওয়ার জন্যই পরবর্তীতে তৈরি হয়েছিল ‘অবহেলিত গােষ্ঠী’?)

নায়েব আহিলকার আশুতােষ ঘােষ সম্বন্ধে যতটুকু জানা যায় তা তাঁর সুযোগ্যা কন্যা ও মাথাভাঙ্গার অন্যতমা প্রেয়সী নারী রাধাময়ী দেবীর কথাতে এবং তাঁর সুযােগ্য সন্তান, পুত্র বিভূতিভূষণ-এর লেখনীতে। এবং মাথাভাঙ্গা সারস্বত উৎসবের মুখপত্র মানসাই-এর লেখক, প্রবন্ধকার অনিন্দ ভট্টাচায্যের প্রবন্ধ ‘উনিশ শতকীয় মনন ও মাথাভাঙ্গার এলিট সংস্কৃতি ও ব্রাহ্মভাবধারার উত্তরাধিকার’-এ। সারস্বত উৎসবের মুখপত্র মানসাই পত্রিকার প্রবন্ধকার তন্ময় রায় ও রাজর্ষি বিশ্বাসের প্রবন্ধ, ‘সােনামণি দেবীর সংক্ষিপ্ত তজীবনকথা’ তে পাওয়া যাচ্ছে আশুতােষ ঘােষ ১৯০৭ সালে মাথাভাঙ্গা গার্লস স্কুলের সম্পাদক নিযুক্ত হন। আশুতােষ ঘােষ ছিলেন ব্রাহ্মভাবধারার মানুষ। তিনি মাথাভাঙ্গা পরগনার নায়েব আহিলকার পদে অধিষ্ঠিত থাকা কালে কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান করতেন নিজের অর্থেই। ১৯০৭ সালে মাথাভাঙ্গার বুকে কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বৃত্তি প্রদান মাথাভাঙ্গার ইতিহাসে গৌরবের অধ্যায়।

হেদেল্লা বর্ম্মা:
যে তিনজনের আলােচনা এ আলােচনায় তাদের মধ্যে সবথেকে অবদমিত যে মানুষটি তিনি হলেন হেদেল্লা বর্ম্মা। পঞ্চানন বর্ম্মার ভাবাদর্শে দীক্ষিত মাথাভাঙ্গার হাজরাহাট নিবাসী কৃষক এবং মাথাভাঙ্গার ক্ষত্রিয় সমাজের প্রধানতম ব্যক্তি। তিনি অন্য দুজনের থেকে ধারে-ভারে, শিক্ষায়-দীক্ষায় যােজন দূরত্বে দাঁড়িয়ে। কিন্তু এই আলােচনার কেন্দ্রে তিনিই অবস্থিত। তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে তৎতকালীন কুচবিহার রাজ্যের একজন মহানতম ব্যক্তিত্ব এবং আইন পেশায় নিযুক্ত ব্যক্তি পঞ্চানন বর্ম্মা। এবং অপরদিকে তাঁর প্রতিপক্ষ কুচবিহার রাজ্যের নায়েব আহিলকার অ-দেশীয় মানুষ আশুতােষ ঘােষ।

আশুতােষ ঘােষের অপশাসন এবং ক্ষত্রিয় সমাজের উপর অন্যায় অত্যাচার:

ক্ষত্রিয় সমিতির বৃত্ত বিবরণীতে পাওয়া যাচ্ছে হেদেল্লা বর্ম্মা একজন প্রধানতম ব্যক্তি মাথাভাঙ্গা ক্ষত্রিয় সমাজের সামাজিকগণের মধ্যে। মাথাভাঙ্গা পরগনার তৎকালীন ক্ষত্রিয় কর্মকাণ্ডের প্রধান মুখ। তিনি ক্ষত্রিয় সমিতির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সুচারুরূপে পালন করতেন। তিনি এবং তৎকালীন ক্ষত্রিয় সমিতির প্রচারক শ্রীযুক্ত ক্ষীরনারায়ণ বর্ম্মা একটি শালিসী সভায় উপস্থিত ছিলেন। সেই শালিসী সভায় একজন দুষ্কার্য্যকারী ব্যক্তির বিচার হয়। ঐ ব্যক্তিটি গ্রামে কোন একটি দুষ্কার্য্য করে। একবার শাসন করিলে কিছুদিন দুষ্কার্য্য করা ছাড়িয়া দেয়। কিছুদিন নিশ্চুপ থাকিয়া আবার তিনি সেই দুষ্কার্য্যটি করিতেন। বারংবার ঐ লােকটি দুষ্কার্য্য করা়য় শালিসী সভায় তাঁকে অধিকতর অর্থ দণ্ড করা হয়। সেই শালিসী সভার ১৫/১৬ দিন পর দুষ্কার্য্যকারী মানুষটি আত্মহত্যা করে। পুলিস যথারীতি তদন্ত করিয়া রিপাের্ট করিল যে ঘটনাটি আত্মহত্যা। এবং ফৌজদারী কার্য্য বিধির ১০৯ বা ১১০ ধারার কোন প্রমান নাই।

অথচ নায়েব আহিলকার আশুতােষ ঘােষ ফৌজদারী কার্য্য বিধির ১০৯ ও ১১০ ধারা অনুসারে অর্থাৎ চোরাই মাল রাখা, চোরের থাপাইত হওয়া এবং অসদুপায়ে জীবীকা অর্জন করার দায়ে দায়ী করিয়া শ্রীযুক্ত হেদেল্লা বর্ম্মা ও শ্রীযুক্ত ক্ষীরনারায়ণ বর্ম্মা মহাশয়ের নামে নােটিশ জারি করাইলেন। মােকদ্দমা চলিতে লাগিল। অন্যায় ও অনিষ্টকর ভাবিয়া ক্ষত্রিয় সমাজ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইয়া মােকদ্দমা চালাইতে লাগিলেন। মাথাভাঙ্গাবাসী ক্ষত্রিয়গণ সবাই অর্থ সাহায্য করিলেন। দীর্ঘদিন মােকদ্দমাটি চলার পর মােকদ্দমাটি ডিস্মিস্ হইয়া গেল। এই মােকদ্দমায় শ্রীযুক্ত হেদেল্লা বর্ম্মা অযাচিত বহু অর্থ ও বহু কষ্ট স্বীকার করিয়াছেন। তবুও তিনি সমাজের গৌরব রক্ষার জন্য সর্বদা অটল ও উদ্দমী ছিলেন। সেজন্য তাঁহাকে ক্ষত্রিয় সমিতিথেকে কৃতজ্ঞতা ও সাধুবাদও জানানাে হয়।

এই ঘটনাটি কেন তৎকালীন নায়েব আহিলকার আশুতােষ ঘােষ ঘটাইলেন? শ্রীযুক্ত হেদেল্লা বর্ম্মার প্রতি তাঁর কিসের রােষ? তিনি কেন এই অপকর্মটি করাইলেন একটি পরগনার প্রশাসনিক প্রধান হয়েও? ইতিহাস সত্যনিষ্ঠ। নির্মম। ইতিহাসের ধর্মই এই। সে একদিন না একদিন মাথা উচিয়ে বিবেকের বিশ্বমন্চে প্রকাশ করে নির্মম সত্যকে। সেই সময়ের ঘটনাক্রমকে আমরা জানতে চেষ্টা করব। কি সেই কারণ এবং
কোন রহস্য আছে এই ঘটনাক্রমের পেছনে?

১৩১৯ সনের ৫ই চৈত্র মাথাভাঙ্গায় মিলনক্ষেত্র। ৭ই চৈত্র মাথাভাঙ্গার নিকটে একজন উচ্চপদস্থ রাজপুরুষ(?) একটি ক্ষত্রিয় চৌকিদারকে হীন কাজ করিতে বলিলেন। চৌকিদার সেই হীনকাজ করিতে অস্বীকার করিলেন। বরং তিনি রুজিরুটির সেই চাকরি ত্যাগ করাই শ্রেয় বলে বিবেচনা করিলেন। এবং চাকুরি ত্যাগ করিতে চাহিলেন।

ক্ষত্রিয় সমিতির তৃতীয় বর্ষের বৃত্তবিবরণী ও চতুর্থ বর্ষের অধিবেশন থেকে কিছু আলােচনা এখানে লিপিবদ্ধ করছি।

“সংবাদ পাইয়া সম্পাদক মাথাভাঙ্গা মহকুমায় গেলে তথাকার নায়েব আহিলকার অর্থাৎ সাবডিভিশন অফিসার শ্রীযুক্ত আশুতােষ ঘােষ মহাশয় দেওয়ানের পত্র বলিয়া একখানি পত্র পড়িয়া শুনাইয়া সম্পাদককে বলিলেন, দেওয়ান মহাশয় চটিয়াছেন; মিলনক্ষেত্রগুলির সমস্ত টাকা সরকারে দিতে হইবে; যে সকল মিলনক্ষেত্রের টাকা রংপুরে গিয়াছে, তাহাও ফেরৎ দিতে হইবে; রাজ্যমধ্যে আর মিলনক্ষেত্র হইতে পারিবে না; ক্ষত্রিয় সমাজের নেতাগণকে ফৌজদারীতে ফেলিয়া ফাটক দেওয়া হইবে; রাজ্য হইতে বিতাড়িত করিয়া দেওয়া হইবে; এবং তাহাদের জমি জমা সমস্ত খাস করিয়া লওয়া হইবে।

সম্পাদক উত্তর করিলেন – মিলনক্ষেত্রের সংসদগণের নিকট যে টাকা আছে, তাহা তাহাদের নিকট সমিতির ধনভাণ্ডারের জন্য প্রদত্ত, গচ্ছিত টাকা; উহা তাহাদের নহে। ঐ টাকা সরকারে দিতে তাহাদের কোন অধিকার নাই। উহা দিলে, তাহারা বিশ্বাসঘাতকতা বা তহবিল তছরূপ অপরাধে অপরাধী হইবেন; এবং যে রাজপুরুষগণ মিলনসংসদের নিকট হইতে ঐ টাকা লওয়ার জন্য জুলুম করিতেছেন, তাহারা নিজেরাও তহবিল তছরূপ অপরাধের সহায়তা অপরাধে অপরাধী হইবেন। আর-

সমিতির ধনভাণ্ডারে প্রেরিত টাকা সম্পাদকের নিজস্ব নহে; সমিতির টাকা। দেওয়ান বাহাদুর যদি নিতান্তই ঐ টাকা চান, ক্ষত্রিয় সমিতির সম্পাদকের বরাবর চিঠী লিখিতে পারেন; চিঠী পাইলে সমিতি নিজ কর্তব্য অবধারণ করিবেন।

অতঃপর অত্যাচার বাড়িতে লাগিল। মিলন সংসদ্গণের নিকট টাকা চাওয়া আরম্ভ আগেই হইয়াছিল। এখন কোন কোন মিলন সংসদের বাড়ী হাকিম স্বয়ং যাইতে লাগিলেন। কোন কোন মিলনসংসদের সদস্যগণকে পিয়ণদ্বারা বা পরওয়ানাদ্বারা, এবং স্থল বিশেষে ওয়ারেন্ট করিয়া পুলিশ দ্বারা ধরিয়া, আনা হইতে লাগিল। সম্মুখে উপস্থিত মিলনসদস্যগণের উপর, এজলাশে উপবিষ্ট নায়েব আহেলকার মহাশয়ের তর্জ্জন গর্জ্জনের এবং ফৌজদারীতে দিয়া ফাটক দিতে, জমি জায়গা খাস করিয়া লইতে, রাজ্য হইতে বিতাড়িত করিয়া দিতে, ভয় প্রদর্শনের সীমা রহিল না। যাহারা মিলনক্ষেত্রের টাকা পুর্বেই ধনভাণ্ডারে পাঠাইয়াছেন, তাহাদেরও নিস্কৃতি নাই। টাকা ফিরাইয়া আনিয়া ট্রেজারীতে দাখিল করিতে জুনুম করা হইতে লাগিল। এইরুপ তর্জ্জন গর্জ্জন ও ভয় প্রদর্শন প্রতিদিন চলিতে লাগিল। স্থল বিশেষে পুলিস দ্বারাও ভয় দেখানাে হইতে লাগিল। উপবীতী ক্ষত্রিয়গণের জায়গীর ও দেবত্তর-জমি খাস করিয়া লওয়ার পরওয়ানা জারী হইল। এবং শুনা গেল সম্পাদকের সম্পত্তি খাস করিয়া লইয়া, তাহাকে রাজ্য হইতে বিতাড়িত করিয়া দেওয়ার নিমিত্ত মাথাভাঙ্গার নায়েব-আহেলকার বাবু দেওয়ান বাহাদুরের বরাবর রিপাের্ট করিলেন। কিন্তু মিলনসংসদ ও দ্রষ্টারা সকলে অটল; দিনের পর দিন নানারূপ তিরস্কৃত ও লাঞ্চিত হইতে লাগিল; কিন্তু তাহাদের উত্তর এক ঃ- টাকা প্রায়শ্চিত্তের টাকা-সমাজের দান-ক্ষত্রিয় সমিতির ধনভাণ্ডারে দেওয়ার জন্য তাহাদের নিকট গচ্ছিত আছে; টাকা তাহাদের নহে; অন্য কাহাকেও সেই টাকা দিবার অধিকার তাহাদের নাই; দেওয়ান বাহাদুর যদি ঐ টাকা চান, তবে ঐ টাকা তাহারা সম্মুখেই ধরিয়া আছেন, কাড়িয়া লইয়া যাইতে পারেন। কুচবিহারবাসী হউক বা রংপুরবাসী হউক বা অন্য অঞ্চলের নিবাসী হউক,ক্ষত্রিয়গণের সমাজ এক; ক্ষত্রিয় সমিতি সেই সমাজের কেন্দ্র; ক্ষত্রিয় সমিতির ধনভান্ডারই সমাজের ধনভাণ্ডার-রক্তভাণ্ড, হৃদয়।

উপরিউক্ত আলােচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অন্ততঃ এটা ধারণা করতেই পারি যে, উচ্চপদস্থ রাজপুরুষ (?) যিনি চৌকিদারকে হীন কাজ করিতে বলিয়াছেন তিনি কে? যদি সেই রাজপুরুষ নায়েব আহিলকার আশুতােষ ঘােষ হয় তবে তিনি যাকে হীন কাজ করিতে বলিয়াছেন তিনি হীন হন নি। হীন হইয়াছেন স্বয়ং নায়েব আহিলকার আশুতােষ ঘােষ।

এবং ক্ষত্রিয় সমিতির বৃত্তবিবরণী পাঠে আমরা অবগত হই যে তৎকালীন নায়েব আহিলকার আশুতােষ ঘােষ মাথাভাঙ্গার ক্ষত্রিয় সমাজের উপর যতটা সম্ভব তিনি অন্যায় ও অত্যাচার করিয়াছেন এবং প্রশাসনিক পদকে কলুষিত করিয়াছেন। অবশ্য এও জানা যাচ্ছে যে তৎকালীন দেওয়ান বাহাদুর শ্রীযুক্ত প্রিয়নাথ ঘােষ কুচবিহারের ডােডেয়ার হাট গিয়া পৈতা লইতে বারণ করিয়াছেন। এ সংবাদ আমরা পাই, বানেশ্বর ধামের নিকটবর্তী গ্রামনিবাসী শ্রীযুক্ত হরকান্ত অধিকারী মহাশয়ের লিখিত একখানি পত্রে (তৃতীয়বর্ষের বৃত্তবিবরণী)। যদি আমরা ধরেই নিই যে দেওয়ান বাহাদুর এরকম পত্র লিখিয়াছেন বা নির্দেশ দিয়াছেন এবং আশুতােষ ঘােষ নায়েব আহিলকার তাঁর দায়িত্ব পালন করিয়াছেন মাত্র। তবুও প্রশ্ন আসে যে, দেওয়ান কি এরকম পত্র লিখিতে পারেন? বা এরকম আদেশ করিতে পারেন? নায়েব আহিলকার মহাশয় বলিয়াছেন, ‘দেওয়ান বাহাদুর চটিয়াছেন’, কিন্তু তিনি সেই পত্র কিন্তু ক্ষত্রিয় সমিতির সম্পাদক মহাশয়ের হস্তে প্রদর্শিত করেন নি বা দেওয়ান বাহাদুরও কিন্তু ক্ষত্রিয় সমিতিতে কোনরূপ পত্র বা নির্দেশ দিয়াছেন বলে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না বা জানা যাচ্ছে না। তাছাড়াও দেখা যাচ্ছে যে নায়েব আহিলকার মহাশয় স্বউদ্যোগে ফৌজদারী কার্য বিধির ১০৯ ও ১১০ ধারা জারি করাইয়াছেন। যে ধারার সঙ্গে হেদেলা বর্ম্মার কোন যােগ নেই। সেই দুষ্কার্য্যকারী ব্যক্তিটি আত্মহত্যা করিয়াছেন পুলিস তদন্ত করিয়া রিপাের্ট দিয়াছেন। তবুও ১০৯ ও ১১০ ফৌজদারী ধারাতে কেস করাইয়া নােটিশ জারি করাইয়াছেন। চোরের মাল রাখা, চোরের থাপাইত হওয়া ও অসৎ উপায়ে জীবীকা অর্জন করার কোন ঘটনার সাথে শ্রীযুক্ত হেদেল্লা বর্ম্মা ও ক্ষত্রিয় সমিতির প্রচারক শ্রীযুক্ত ক্ষীরনারায়ণ বর্ম্মার কি যােগাযােগ? তবে কি তিনি ক্ষত্রিয় সমিতি ও ক্ষত্রিয় সমিতির সঙ্গে যুক্ত মানুষজনকে বিভিন্ন ভাবে হয়রানি করার জন্যই এই কাজ করিয়াছেন? ঘটনাক্রম কিন্তু সেদিকেই ঈঙ্গিত করে। বৃত্তবিবরণীতে যা উল্লেখ আছে তা কিন্তু মারাত্মক ঈঙ্গিত বহন করে। তিনি বলিয়াছেন, “মিলনক্ষেত্রগুলির সমস্ত টাকা সরকারে দিতে হইবে; যে সকল মিলনক্ষেত্রের টাকা রংপুরে গিয়াছে, তাহাও ফেরৎ দিতে হইবে; রাজ্যমধ্যে আর মিলনক্ষেত্র হইতে পারিবে না; ক্ষত্রিয় সমাজের নেতাগণকে ফৌজদারীতে ফেলিয়া ফাটক দেওয়া হইবে; রাজ্য হইতে বিতাড়িত করিয়া দেওয়া হইবে; এবং তাহাদের জমি জমা সমস্ত খাস করিয়া লওয়া হইবে।

পরিশেষে উল্লেখ করার মত বিষয় যে, ক্ষত্রিয় সমিতির প্রাণ পুরুষ সেদিন কিন্তু যথাযথ প্রত্যুত্তর দিয়েছেন নায়েব আহিলকার আশুতােষ ঘােষ মহাশয়কে। পঞ্চানন বর্ম্মা বলিয়াছেন, “মিলনক্ষেত্রের সংসদ্গণের নিকট যে টাকা আছে, তাহা তাহাদের নিকট সমিতির ধনভাণ্ডারের জন্য প্রদত্ত, গচ্ছিত টাকা; উহা তাহাদের নহে। ঐ টাকা সরকারে দিতে তাহাদের কোন অধিকার নাই। উহা দিলে, তাহারা বিশ্বাসঘাতকতা বা তহবিলতছরূপ অপরাধে অপরাধী হইবেন; এবং যে রাজপুরুষগণ মিলনসংসদের নিকট হইতে ঐ টাকা লওয়ার জন্য জুলুম করিতেছেন, তাহারা নিজেরাও তহবিল তছরূপ অপরাধের সহায়তা অপরাধে অপরাধী হইবেন।” এবং তিনি জোরের সহিত বলিয়াছেন যে, সমিতির ধনভাণ্ডারে প্রেরিত টাকা সম্পাদকের নিজস্ব নহে; সমিতির টাকা। দেওয়ান বাহাদুর যদি নিতান্তই ঐ টাকা চান, ক্ষত্রিয় সমিতির সম্পাদকের বরাবর চিঠী লিখিতে পারেন; চিঠী পাইলে সমিতি নিজ কর্ততব্য অবধারণ করিবেন।” এবং তাঁর শেখানাে বুলিই মাথাভাঙ্গার তৎকালীন ক্ষত্রিয় সমাজ অক্ষরে অক্ষরে পালন করিয়াছিলেন। তাই তাে তাদের শত সমস্যা, ঝঞ্ঝা, অত্যাচারের কালেও তারা এক স্বরে উচ্চ কণ্ঠে বলিয়াছেন, টাকা প্রায়শ্চিত্তের টাকা-সমাজের দান-ক্ষত্রিয় সমিতির ধনভাণ্ডারে দেওয়ার জন্য তাহাদের নিকট গচ্ছিত আছে; টাকা তাহাদের নহে; অন্য কাহাকেও সেই টাকা দিবার অধিকার তাহাদের নাই; দেওয়ান বাহাদুর যদি ঐ টাকা চান, তবে ঐ টাকা তাহারা সম্মুখেই ধরিয়া আছেন, কাড়িয়া লইয়া যাইতে পারেন। কুচবিহারবাসী হউক বা রংপুরবাসী হউক বা অন্য অঞ্চলের নিবাসী হউক, ক্ষত্রিয়গণের সমাজ এক; ক্ষত্রিয় সমিতি সেই সমাজের কেন্দ্র; ক্ষত্রিয় সমিতির ধনভাণ্ডারই সমাজের ধনভাণ্ডার-রক্তভাণ্ড, হৃদয়।

তবে আশুতােষ ঘােষ তৎকালীন সময়ে ক্ষত্রিয় সমিতির উপর প্রশাসনিক উচ্চ পদে থেকে অসৎ উপায়ে প্রশাসনিক পদকে অপব্যবহার করেও বিফলই হয়েছিলেন। কারণ তাঁর হয়ত কোন ধারণা ছিল না যে পঞ্চানন বর্মার মত ব্যক্তিত্ব যেখানে ক্ষত্রিয় সমিতির সম্পাদক সেখানে তিনি সফল হতে পারেনই না।


# Mathabhanga Kshatrya Samiti # Nayeb Ahilkar Ashutosh Ghosh # Panchanan Barma # Hedella Barma # Khirnarayan Barma # Misrule by Nayeb Ashutosh Gosh # Cooch Behar Kshatrya # Rangpur Kshatrya #Koch Rajbanshi # Kamtabihari bhasha sahitya

Facebook Comments
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: