কোচ রাজবংশী সমাজের বৈশিষ্ট্য, অভ্যাস ও রীতিনীতি / সাথে কিছু মন্তব্য

Posted by

ডঃ চারুচন্দ্র সান্যাল ওঁনার “দি রাজবংশীস অফ নর্থবেঙ্গল” 1965 বইতে জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং আর কোচবিহারের রাজবংশীদের বৈশিষ্ট্য, অভ্যাস আর রীতিনীতি সম্পর্কে যা লিপিবদ্ধ করেছেন তা তুলে ধরলাম। উনি ওঁনার বইতে জলপাইগুড়ির রাজবংশী সম্পর্কেই বেশী করে উল্লেখ করেছেন। উনি ওঁনার এই বইতে তুলনামূলক ব্যাপারগুলি যেন ” তথাকথিত বাঙালি” সমাজের সঙ্গে তুলনা করার চেষ্টা করেছেন। মনে হবে যেন “তথাকথিত বাঙালি ” ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি হল মাপকাঠি আর তার পরিপ্রেক্ষিতে কোচ রাজবংশী ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। যদিও দুটো আলাদা মেরুর। 

সংগৃহীত

 
বৈশিষ্ট্য, অভ্যাস ও রীতিনীতি 

লেখক ডঃ চারুচন্দ্র সান্যাল ব্যক্তিগত ভাবে বৈকুন্ঠপুরের জমিদার, তাঁদের সন্তান-সন্ততি এবং নিকট আত্মীয়দের (রাজগণ) দেখেছেন। তাঁদের গাত্রবর্ণ ফর্সা, একটু হলদেটে ভাব আছে। অনেক রাজবংশী তামাটে কেউ কেউ আবার কৃষ্ণবর্ণ। একটা বিষয়ে সবার মিল, তাদের নাক চ্যাপ্টা আর নাকের পাটা বেশ চওড়া। হনুর হাড় উঁচু, ঠোঁট মোটা, চোখ সাধারনত ছোট আর সামান্য টানা।

রাজবংশীরা বাংলা বলেন কিন্তু আন্চলিক উচ্চারণে কখনো কখনো এই বাংলা মান্য বাংলার থেকে অনেক পৃথক। গ্রামের বয়স্ক মহিলারা বুকের উপর দিয়ে বাঁধা হাঁটু – ঝুল একখন্ড বস্ত্র পরেন যাকে বলা হয় ফোতা। ফোতাগুলি হাতে তৈরি সাধারণত লাল, নীল রঙের। মেশিনে তৈরি কাপড় এই হাতের তাঁত শিল্পীদের মেরে ফেলেছে। ফোতার জায়গায় এসেছে মিলের কাপড়। মহিলারা সাধারনত শরীর ঢাকার জন্য অন্য কোনও বস্ত্রখন্ড ব্যবহার করেন না।
 
রাজবংশী, কোচ, মেচ আর ধীমালদের মধ্যে খোলাখুলি বিবাহ সম্পর্কে কোনো বাধা নেই। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে রাজবংশীরা স্বজাতির মধ্যে বিয়ে করতেই ভালবাসছেন। “পানিছিটা”, “ছত্রদানী” , “ঘর সোন্দানী” এইরকম বহু বিচিত্র রকমের বিবাহ দেখা যায়।
 
সধবা স্ত্রীলোক সর্বদাই যে কপালে সিঁদুর পরেন বা হাতে নোয়া পরেন এমন নয়। বয়স্ক মানুষদের কাছ থেকে লেখক ডঃ সান্যাল জানতে পেরেছেন যে বছর কুড়ি আগে বিয়ের সময় মেয়েদের কপালে সামান্য সিঁদুর ছোঁওয়ানো হত কিন্তু সবসময় সিঁদুর পরতে হবে এমন কোনও বিধি নিষেধ ছিল না। বাঁ হাতে আট-দশটা জোড়া শাখাই ছিল সধবার এয়োতি চিন্হ। এখন মাথায় সামান্য সিঁদুর ছোঁওয়ানোর প্রচলন দেখা দিলেও গ্রামে গন্জে কোথাও হাতে নোয়া পরার রেওয়াজ নেই। বিধবারা যদি আবার বিয়েও করেন তবে কখনো শাঁখা বা সিঁদুর পরেন না।
 
মেয়েরা রুপোর গয়না পরেন। সূয্যাহার, চন্দ্রাহার আর ছোড়াকাঠি বৈশিষ্ট্যপূর্ণবাংলার অন্য কোথাও এই অলংকার দেখা যায় না।
কৃষিকাজ করার সময় একখন্ড লেংটি পরে কাজ করলেও গ্রামের বাইরে যাবার সময় পুরুষরা পুরো বস্ত্র আর শার্ট পরেন। শীতকালে গায়ে দেন চাদর। 
বাচ্চাদের পিঠে বেঁধে কাজ করেন রাজবংশী মেয়েরা। একখন্ড কাপড় দিয়ে পিঠের সঙ্গে বাঁধা থাকে বাচ্চা। মায়ের পিঠের দিকে ঝুলতে থাকে তার পা, পিঠে বাঁধা কাপড়ের উপর বেরিয়ে থাকে মাথা। (1)
এই অবস্থায় বাচ্চাটির কোনও কষ্ট হয় না। ছেলেবেলায় লেখক ডঃ সান্যালও এইভাবে রাজবংশী মহিলার পিঠে ঘুরেছেন। কেমন লেগেছিল তাঁর মনে নেই কিন্তু ঘটনাটি মনে আছে। রুপাবাঈ নামে একজন রাজবংশী মহিলা ওপরের বর্ণনার মত পিঠে বাচ্চা বেঁধে নিয়ে আসতেন।
রাজবংশীরা বিশেষত মেয়েরা খুব পান খান। সুপুরি গাছে লতিয়ে ওঠা পান গাছ থেকে পান ছিঁড়ে খান তারা।
বৈকুন্ঠপুরের জমিদার পি.ডি. রায়কত একবার লেখককে জোর করে তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি পান খাওয়ান। কাঁচা সুপুরি আর চুন দিয়ে সেই পান একটু চিবোতে না চিবোতেই লেখকের কান লাল হয়ে তিনি ঘামতে শুরু করেন। যার অভ্যাস নেই তার কাছে এই নেশা ভয়ংকর আর কষ্টসাধ্য।
(1) এইভাবে বাচ্চা বেঁধে নেওয়াকে বলে বুকুনি বান্ধা।
চলতি কথা আছে একটি – ‘ছাওয়াটাক বুকুনি বান্ধি কামাই করেক্’ – অর্থাৎ বাচ্চাটিকে পিঠে বাঁধো আর তারপর কাজ করো। যদি মুড়ি বা কাপড় এইভাবে পিঠে বাঁধা থাকে তবে তাকে বলে ‘বকোনা বান্ধা’।
 
প্রকাশ্যে না খেলেও মেয়েরা বাড়িতে তামাক খান। পুরুষরা তামাকখোর। বানানো তামাক ছিলিমে রেখে আগুন ধরিয়ে দুহাতের চেটোয় সরু দিকটা ধরে হাতের চেটোর ফাঁক দিয়ে তারা ধোঁওয়া টানেন। তামাক পাতা ছোট ছোট করে কেটে চিটে গুড় মিলিয়ে তৈরী হয় তামাকের মন্ড, বানানো তামাক। কখনো তাঁরা হুঁকাও খান। আস্ত নারকোলের মালাইয়ে জলভরার ব্যবস্থা আর মালাইয়ের মাথায় খড়াখাড়ি লাগানো কাঠের নল, নলের মাথায় থাকে তামাক ভরা মাটির ছিলিম। মালাইয়ের একপাশে থাকে ফুটো সেখান দিয়ে ধোওয়া টানতে হয়, এই হচ্ছে হুঁকো।
 
রাজবংশী মেয়েরা মাথায় কোনও আবরণ রাখেন না, পুরুষরাও রাখেন না। রাজবংশী মেয়েরা কখনো পর্দাপ্রথা মানেননি। স্বাধীনভাবে বিচরণ করেছেন। তাদের মাথার চুল খুব সুন্দর করে খোঁপা করা। পরিপাটি করে চুল আঁচরে আলগা ফাঁস দিয়ে তাঁরা মাথার পিছনে, কখনো মাথার ওপরে চুল বেঁধে রাখেন। 
 
পূজো বা অনুষ্ঠানে তরুণী আর অল্প বয়সি মেয়েরা মাথার মাঝখান দিয়ে সিঁথি কেটে চুল বাঁধে। চুল ঠিক রাখার জন্য প্রচুর সরষের তেল দেয় মাথায়। 
বাইরে বেরোবার সময় মেয়েরা নিজেদের কাছে ছোট চাকু রাখেন। তাঁদের বিশ্বাস চাকু বা লোহা দুষ্ট আত্মার হাত থেকে রক্ষা করে। হাটের দিনে অনেকটা পথ পেরিয়ে সওদা করতে যান যে রাজবংশী মহিলা তাঁর হাতে চাকু বা দাও দেখা আশ্চর্য কিছু নয়।
তাদের খাদ্য খুব সাদাসিধে। গ্রামের লোকেরা দুধ খান কিন্তু দুগ্ধজাত ঘি যা পূর্ব এবং দক্ষিণবঙ্গের লোকেদের অত্যন্ত প্রিয়, তা মোটেও পছন্দ করেন না।
ছেকা, পেল্কা আর সিদোল এবং দুধের তৈরি কিছু খাদ্যে এই অন্চলের বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলার অন্য কোথাও এই ধরনের খাবার তৈরী হয় না। 
কয়েক বছর আগে লেখকের বাড়িতে একদল রাজবংশী কৃষক বিবাহ উপলক্ষে নেমন্তন্ন খেতে এসেছিলেন। চাল এবং সুগন্ধী ঘিয়ে তৈরি পোলাও তাঁদের পাতে পরিবেশন করা হয়। খাবার নষ্ট হয়ে গেছে সবাইকে এ কথা জানিয়ে তাঁরা কেউই খান না। পরে ঘি ছাড়া সাদা ভাতের ব্যবস্থা করা হলে সবাই খুব পরিতৃপ্তি করে খান। রাজবংশীদের মধ্যে বিষাদগ্রস্ত মুখকালো করা মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। দারিদ্র সত্বেও তাদের দেখে মনে হয় সবাই সুখী, প্রাণবন্ত। 
রাজবংশীরা হিন্দু তবে নিজেদের আচার অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য আছে। সব রাজবংশীই সর্পদেবতা বিষহরি বা মনসার পূজো করেন। বিষহরি পূজো উপলক্ষে বেশ কয়েকদিন ধরে দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে নাচ গান হয়। লেখক প্রকাশ্যে কোনো মহিলাকে নাচতে দেখেননি। পুরুষরাই মেয়ে সেজে নাচ করেন। লেখক লক্ষ্য করেছেন যে নাচের সময় তাঁদের পা মাটি থেকে ছয় ইন্চির বেশী ওঠেনা। 
 
একবার জলপাইগুড়িতে এক গ্রামীণ দেবতার সামনে প্যাঁচ দিয়ে ঘাড় মটকে ছাগল বলি দেবার এক বীভৎস দৃশ্য দেখেন লেখক। চারজন লোক শক্ত করে ধরে ছাগলটিকে সোজা করে রাখে, দুজন মাথাটা পেঁচিয়ে ঘুরিয়ে এনে দমবন্ধ করে মেরে ফেলে। খবর পাওয়া গেছে এখনো জলপাইগুড়ির জল্পেশ মন্দিরে শিবের সামনে এবং কোচবিহারে বাণেশ্বর মন্দিরে সিদ্ধেশ্বরীর সামনে ফাঁস দিয়ে বা পাথর ছুড়ে ছাগল বলি দেওয়া হয়। এক কোপে ধর থেকে মাথা আলাদা করে বলি দেওয়ার প্রচলিত হিন্দু প্রথার মত এই বলি প্রথা নয় । 
ফেব্রুয়ারি মার্চ মাসে শিবরাত্রির সময় জল্পেশ মন্দিরে, জয়ন্তীর গুহায়, জলপাইগুড়ির ফাঁসখাওয়া, চামূর্চি আর কোচবিহারের বানেশ্বর মন্দিরে মহাধুমধামে, আড়ম্বরে মহাদেবের পূজো হয়। হাজার হাজার ভক্ত আসেন, তাঁদের অধিকাংশই রাজবংশী। 
 
এই অঞ্চলে মহাদেবকে মহাকাল বলে ডাকা হয়।নদীর দেবী তিস্তাবুড়ির পুজোও করেন রাজবংশীরা।  এইরকম কয়েকটি পূজো দেখার সুযোগ হয়েছে লেখকের। কাঠ সংগ্রহের জন্য জঙ্গলে ঢোকার আগে তাঁরা বনের দেবী শালেশ্বরীর পূজো করেন।
 
জলপাইগুড়ি শহরের কাছে খুব পুরোনো একটি কালী মন্দির আছে, শোনা যায় এখানে নরবলির প্রচলন ছিল। নয়ন কাপালি নামে একজন রাজবংশী যুবক কালী মায়ের সামনে একটি লোককে বলি দেয়, জেলার পুরোনো মানুষদের এ কথা মনে আছে । স্কুলে পড়ার সময় লেখক এই গল্পটি শোনেন। একথাও জানা যায় যে দেড়শো বছর আগে বৈকুণ্ঠপুরে এবং কোচবিহারে দুর্গা মূর্তির সামনে নরবলি হত। মা কালী আর দুর্গার সামনে নরবলি দেবার কাজটা করত মূলত চুতিয়া, খেন, কোচ, অহম, আর কাছারি উপজাতির লোকেরা । এঁরা আগে ছিলেন কামরূপের অধিবাসী। 
 
মার্চ এপ্রিল মাসে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে সব রাজবংশীই বিষবা বা বিষুয়া উৎসব পালন করেন। ওই দিন পূর্নবয়স্ক জোয়ান রাজবংশী যুবকরা অস্ত্র হাতে জঙ্গলে শিকার করতে যান। খাবার উপযোগী কোনো প্রাণীকে শিকার করে পুড়িয়ে অথবা রান্না করে তার মাংস না খেলে সামনের বছরটা মোটেও ভালো যাবেনা, এমনি লোক বিশ্বাস । জলপাইগুড়ি , কোচবিহার আর অসমের রাজবংশী রা এই বিষুবা বসন্তের শিকার উৎসব পালন করে থাকেন। ভারতের অন্যান্য কিছু প্রদেশে এবং বার্মাতেও এইরকম উৎসব পালিত হয়। 
রাজবংশীরা মৃতদেহ দাহ করেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন দাঁত ওঠার আগে শিশুর মৃত্যু , অপঘাতে মৃত্যু, অথবা মহামারীর সময় দাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়লে মৃত দেহ মাটিতে পুতে দেওয়া হয়। দাহর পর চিতা থেকে ললাট অস্থি তুলে এনে ভাসিয়ে দেওয়া হয় গঙ্গা অথবা করতোয়ার জলে। প্রথম সন্তানের মৃত্যু হলে বাড়ির কাছেই মাটি দেওয়া হয়। শিশুটির আত্মা বাড়ির আশেপাশে ঘুরে বেড়াবে এবং সুযোগ পেয়েই মায়ের জঠরে ঢুকে পরলেই মা আবার গর্ভবতী হবে এইরকম একটা বিশ্বাস কাজ করে।
 
পরপর ক্রমাগত মৃত সন্তান প্রসব করলে যে কোনো একটি মৃত সন্তানের আঙ্গুলের একটা অংশ কেটে বাড়ি থেকে অনেক দূরে পুঁতে ফেললে আশা করা হয় ভবিষ্যতে ওই দুষ্ট আত্মা আর মায়ের পেটে সিঁধতে পারবেনা। 
 
বর্তমানে পোশাকে পুরোনো রীতিনীতি আর ধর্মীয় আচরণে এমনকি বৈশিষ্ট্যে এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে যে শিক্ষিত সমাজে একজন ব্রাহ্মণ হিন্দু আর রাজবংশী র মধ্যে পার্থক্য নেই বললেই চলে । স্রোতে সম্পূর্ণ মিশে যাবার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন তাঁরা। সম্প্রতি বর্ণহিন্দু এবং রাজবংশীদের অনেকগুলি অসবর্ণ বিবাহ এই পরিবর্তনের কাজ কে আরো ত্বরান্বিত করছে।



 
সংগৃহীত
কিছু কথা
 
রাজবংশীদের মধ্যে যে বৈচত্র্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান লেখক ঠিকই উপলব্ধি করেছেন। শুধু শারীরিক গঠনে নয় চিন্তা ধারা জায়গাভেদে আচার ব্যবহারের কিছুটা ফারাক আবার ভাষার উচ্চারণেও কিছু কিছু ফারাক আমরা দেখতে পাই। তবে সামান্য পার্থক্য থাকলেও শিকড় যে একই ছিল তা বোঝা যায়। 
 
ভাষার ক্ষেত্রে যদি বলি, লেখক ডঃ সান্যাল এখানে এখানকার ভাষাকে বাংলার উপভাষা বলেছেন কিন্তু এটা সঠিক নয়। লেখক আবার নিজেই বলেছেন “কখনো কখনো এই বাংলা মান্য বাংলার থেকে অনেক পৃথক”, নরসিং কে নরসিংহ বললেও দুটো আলাদা ভাষা হয়ে যায়। বাংলার সঙ্গে যখন কোনো সম্পর্কই নেই পৃথক তো হবেই। বাংলার সঙ্গে হিন্দীর অনেক মিল আছে তাই বুলি কী কেউ বলবে কখনো কখনো বাংলা ভাষাটা হিন্দীর থেকে অনেক পৃথক আসলে বাংলা হিন্দীরই একটা রুপ? লেখক তো জলপাইগুড়িতেই জন্মগ্রহন করেছেন। লেখক কামতাপুরী /রাজবংশী ভাষা বলতে পারতেন কিনা সন্দেহ আছে।
 
লেখক কখনো রাজবংশী, পলিয়া আর কোচ কে আলাদা ভাবে দেখিয়েছেন আবার কখনো বলেছেন আসলে “কোচ রাজবংশী আর পলিয়া আসলে একই জিনিসের তিনটি নাম। রাজবংশী ভীষণভাবে মিশ্র জাতি। কথাটা খারাপ বলেন নি। কারন  পুরোনো সেনসাস রিপোর্ট আর ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি দেখলেই বোঝা যায়। যারা ভাষা কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে অস্বীকার করবে ধরে নেবেন উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, আর শুধু রয়াল নাম “রাজবংশী” টা নিয়ে নিজের স্ট্যাটাস আর সরকারী সুযোগসুবিধা নিয়ে চলছে। 
 
মহিলাদের পোশাক আর অলংকারেও অনেক পরিবর্তন এসেছে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। 
তবে একটা জিনিস লক্ষ্যের কোচ রাজবংশীরা শুধু অন্যের কৃষ্টি সংস্কৃতিগুলি ধার করে চলেছে নিজেদের আদি বাসস্থানে আর নিজেদের পরিবর্তনে ব্যস্ত। নিজেরটা ধরে রেখে অন্যকে বরং নিজের ভাষা কৃষ্টি সংস্কৃতির মধ্যে নিয়ে আসতে পারেনি। ভাষার ক্ষেত্রেও একই। পুরো বিষয়টা একটা জাতির অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়ে বিপজ্জনক। সরকারও এক্ষেত্রে উদাসীন, উদাসীন নয় বরং কি করে কোচ রাজবংশীর ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি বিলুপ্ত করে তাদের বাংলা বা অহমীয়া সংস্কৃতি সম্পন্ন বানানো যায় সেই চেষ্টায় যেন রত। 
 
রাজবংশী সমাজে মদ্যপানের বিষয়টা খুব খারাপ ভাবে দেখা হত, অথচ ধূমপান যেন অনেকটা ছারপত্র প্রাপ্ত, তবে পরিবার বিশেষে ফারাক থাকবেই। বিশেষ করে গ্রামীণ পরিবারগুলিতে ধূমপানের বিষয়টা খোলাখুলি। এখন অবশ্য দুটোই যেন সমান তালে। যা অন্যান্য সমাজেও পরিলক্ষিত। 
 
ছেকা, পেল্কা, সিদল কোচ রাজবংশীর পেটেন্ট খাবার। বরং আজকাল বলা যেতে পারে শুধু রাজবংশী নয় পুরো ঐতিহাসিক কামতা বাসীর পেটেন্ট খাবার। 
 
ভাষা, কৃষ্টি, আচার, অনুষ্ঠান প্রত্যেক ক্ষেত্রে কোচ রাজবংশী সমাজের সাথে বাঙালি, অহমীয়া বা বিহারীদের পার্থক্য দেখা যায় অথচ আজকের দিনে অনেক কোচ রাজবংশী নিজের পরিচয় গোপন করে অন্যান্য আইডেন্টিটি নিতে ব্যস্ত। জানি না যাঁরা এই ভাবে নিজের সমাজ সংস্কৃতি থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করছে তারা কী আদৌ রাজবংশী? নাকি তাদেরকে হীনমন্যতার ট্যাবলেট খাইয়ে দেওয়া হয়েছে বংশ পরম্পরায়? 
——————————————————————————————————————–
 

Facebook Comments